রবিবার, ৭ই কার্তিক, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ : ২২শে অক্টোবর, ২০১৭ ইং

এখনো ধরা ছোঁয়ার বাইরে ছয় জঙ্গী

ডেস্ক রিপোর্ট, ক্রাইম ওয়াচ 

পুলিশের অভিযানে নাস্তানাবুদ হচ্ছে জঙ্গীদের আতুরঘর। তবুও নির্মূল করা যাচ্ছে না তাদের। গতকাল দিবাগত রাতে নব্য জেএমবি নেতা নুরুল ইসলাম মারজান ও তার সহযোগী সাদ্দাম হোসেন নিহত হয়েছেন।

 

তবে এখনো পুলিশের ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন আরো ছয় জঙ্গী। এরা হলেন- মেজর সৈয়দ জিয়াউল হক, মাইনুল ইসলাম মুসা, রাজীব গান্ধী ওরফে সুভাষ গান্ধী, বাশারুজ্জামান চকলেট, রিপন এবং খালেদ।

 

পুলিশের ভাষ্য জঙ্গী বিরোধী অভিযান একটি চলমান প্রক্রিয়া। একের পর এক অভিযানে জঙ্গীদের নিহত হওয়া ও গ্রেপ্তার হওয়ার ঘটনায় তাদের মনোবল অনেকটাই ভেঙ্গে গেছে। তবে এখনও নির্মূল করা যায়নি জঙ্গীদের।

 

মোস্টওয়ান্টেড মুসা নব্য জেএমবির শীর্ষ নেতা মাঈনুল ইসলাম ওরফে মুসা বাংলা ভাই নামে পরিচিত সিদ্দিকুল ইসলামের হাত ধরে জঙ্গীবাদে জড়িয়ে পড়ে এক যুগের বেশি সময় আগে। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারে আসার পর ২০০৪ সালে পুরনো জেএমবি রাজশাহীর বাগমারা, নওগাঁর আত্রাই, রানীনগর ও নাটোরের নলডাঙ্গার বিস্তৃত অঞ্চলে ত্রাস ছড়িয়ে জঙ্গী নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করে।

 

ওই সময়ের মাঈনুলই এখনকার মুসা যিনি তখন তাহেরপুর ডিগ্রী কলেজে একাদশ শ্রেণীর ছাত্র জেএমজেবির সঙ্গে জড়ায়। বাগমারা উপজেলার গণিপুর ইউনিয়নের বজ্রকোলা গ্রামের মসজিদের সদ্যপ্রয়াত মুয়াজ্জিন আবুল কালাম মোল্লার ছেলে মাঈনুল ইসলাম।

 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান শুরু হলে সিদ্দিকুল ইসলামের মতো আত্মগোপনে চলে যায় মাঈনুলও। আত্মগোপনে থেকে রাজশাহী কলেজে এসে ভর্তি হন তিনি। তারপর সেখান থেকে ঢাকা কলেজে পড়াশোনা করেন। চলতি বছরের শুরুতে উত্তরার একটি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন।

 

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ঢাকার মিরপুরের রূপনগরে পুলিশের অভিযানে নিহত নব্য জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের নেতা সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদুল ইসলামের মেয়ে ওই স্কুলেই পড়ত। মাঈনুল ইসলাম মুসার স্ত্রী তৃষ্ণামনি ওরফে উম্মে আয়েশা পুলিশকে বলেছেন মুসা এখন ঢাকার আশে পাশেই অবস্থান করছেন।

 

রাজধানীর গুলশান, কল্যাণপুর ও শোলাকিয়া হামলার ‘মাস্টারমাইন্ড’ তামিম চৌধুরী এবং চাকরিচ্যুত সেনাবাহিনীর মেজর জিয়াউল হককে ধরিয়ে দিলে ২০ লাখ টাকা পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছে পুলিশ। কে এই মেজর জিয়াউল হক?

 

জিয়াউলের হকের পুরো নাম সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক। তার বাবার নাম সৈয়দ মোহাম্মদ জিল্লুল হক। বাড়ি মৌলভীবাজারের মোস্তফাপুরে। সর্বশেষ ব্যবহৃত বর্তমান ঠিকানা পলাশ, মিরপুর সেনানিবাস, ঢাকা।

 

মূলত সেনাবাহিনীতে একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানচেষ্টার পরই ২০১২ সালে আলোচনায় আসেন মেজর (চাকরিচ্যুত) সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক।

 

ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই জিয়ার আর কোনো সন্ধান মেলেনি। জিয়াকে ধরতে সেই সময় পটুয়াখালী শহরের সবুজবাগ এলাকায় জিয়ার শ্বশুর মোখলেছুর রহমানের বাসায় দফায় দফায় অভিযান চালায় পুলিশ। রাজধানীর কয়েকটি স্থানেও জিয়ার খোঁজে চলে অভিযান।

 

কিন্তু আজও জিয়া রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি সেনাসদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সেনাবাহিনীর সাবেক ও বর্তমান কিছু সদস্য দেশের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত এবং সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থানের চেষ্টা করেছিল। ২০১১ সালের ১৩ ডিসেম্বর এই চক্রান্ত সেনাবাহিনী জানতে পারে।

 

১৯ জানুযারি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়েছিল, এ ঘটনার সঙ্গে সেনাবাহিনীর মধ্যম পর্যায়ের ১৪ থেকে ১৬ কর্মকর্তা জড়িত থাকতে পারেন। সেই সময় সেনা বাহিনীর সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, মেজর জিয়ার হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে জড়িত।

 

রাজীব গান্ধী:

রাজীব গান্ধী ওরফে সুভাষ গান্ধী ওরফে গান্ধী নব্য জেএমবি’র উত্তরবঙ্গের কমান্ডার ছিল। গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলায় সে সন্ত্রাসী পাঠিয়েছিল। যখন কোনও হামলায় দক্ষ সন্ত্রাসীর প্রয়োজন হয়, তখন সে তা সরবরাহ করত। সে গুলশানে দুজন এবং শোলাকিয়া একজন সন্ত্রাসী পাঠিয়েছিল বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।

 

বাশারুজ্জামান চকলেট:

বাশারুজ্জামান চকলেট নব্য জেএমবির শীর্ষ কমান্ডারদের মধ্যে অন্যমত। সর্বশেষ র‌্যাবের প্রকাশিত নিখোঁজের তালিকার ১৮ নম্বরে ছিল বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট বাশার ওরফে চকলেট। তার গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর তানোর উপজেলার লালপুরে। সে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। তার নিখোঁজের ঘটনায় কলাবাগান থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) রয়েছে। গত ৫ জানুয়ারি থেকে সে নিখোঁজ রয়েছে। সে দেশেই আছে এবং তাকে গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশ দেশের বিভিন্নস্থানে অভিযান চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম।

 

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রেজাউল করিম হত্যার পর গত বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে ভারতে চলে যায় রিপন ও খালিদ। তারা আর দেশে আসেনি।’ ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে খুন করে জঙ্গিরা। এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিল ওই দুই জঙ্গি।

 

ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষ শাখা কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, এখন বাশারুজ্জামান চকলেটসহ পাঁচ-ছয়জন জঙ্গী বাইরে রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে আমার অভিযান চলমান রয়েছে। এছাড়াও একজন জঙ্গী নিহত হওয়ার পরে আরেকজন জঙ্গী নেতা হিসেবে দলের হাল ধরেন।

 

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘গত ১ জুলাই সংঘটিত গুলশানের হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনাটি তদন্ত করছে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ইউনিট। আমরা আগেই বলেছি এটি একটি লার্জার পিকচার। হলি আর্টিজানে যারা ঢুকেছিল এবং যারা পেছনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে তাদের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছি। কেউ কেউ ধরা পেড়েছে। অভিযানে নিহত হচ্ছে। কেউ গ্রেপ্তার হচ্ছে। গুলশান ও ৭ জুলাই সংঘঠিত শোলাকিয়ার ঘটনার পর আমাদের অভিযানে আবু রায়হান তারেক নিহত হয়েছে।

 

সে গুলশানের হামলাকারীদের প্রশিক্ষক ছিল। রিগ্যান নামে একজনকে আমরা জীবিত ধরেছি। সে কোরআনের শিক্ষা দিত। এছাড়া মিরপুরের রূপনগরে কথিত মেজর মুরাদ পুলিশি অভিযানে মারা গেছে। সেও প্রশিক্ষক ছিল। মূলত গুলশান ও শোলাকিয়ার প্রশিক্ষক ছিল মুরাদ ও তানভীর। সবকিুছুর সমন্বয়ক ছিল তামীম চৌধুরী। সেও নারায়ণগঞ্জে মারা গেছে। আরেকজন বসুন্ধরায় বাসাভাড়া নিয়েছিল আবদুল করীম নামে। সেও আজিমপুরে মারা গেছে। আরও কিছু নাম আসছে।

 

জেএমবির ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ শক্তি খর্ব করা হয়েছে উল্লেখ করে মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘ইতোমধ্যে চারটি ঘটনায় নব্য জেএমবির কমান্ডিং পর্যায়ের নেতা, সমন্বয়কারী এবং প্রশিক্ষক নিহত হয়েছে। এর মধ্যে কল্যাণপুরের অভিযানে চার জন কমান্ডিং পর্যায়ের নেতা, মিরপুরের রূপনগরে প্রশিক্ষক জাহিদুল ইসলাম (মেজর মুরাদ), জঙ্গিদের জন্য বিভিন্ন জায়গায় বাসা ভাড়া করে দেওয়ার সমন্বয়কারী জঙ্গি তানভীর (করিম) এবং মূল সমন্বয়কারী তামিম চৌধুরী নারায়ণগঞ্জে নিহত হয়েছে।’

 

ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, এখনও এই জঙ্গি সংগঠনের কমান্ডিং পর্যায়ের বেশ কয়েকজন বাইরে রয়েছে। তাদের মধ্যে মো. বাশারুজ্জামান ওরফে বাশার চকলেট, রাজীব গান্ধী ওরফে সুভাষ গান্ধী ওরফে গান্ধী, রিপন ও খালিদ অন্যতম।’ তাই আমাদের অব্যাহত অভিযানের মাধ্যমে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।

বার্তা কক্ষ মেইল:

news.crimewatchbd24@gmail.com

বার্তা কক্ষ মুঠোফোন:

+৮৮ ০১৯ ২০০ ৯৯২৮৮

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত "ক্রাইম ওয়াচ"

Design & Devaloped BY Popular-IT.Com