শনিবার, ৪ঠা ভাদ্র, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ : ১৯শে আগস্ট, ২০১৭ ইং

নওগাঁ ৩ বছরের ব্যবধানে ধানের দাম বেড়েছে মণ প্রতি প্রায় ৫শ’ টাকা

মোঃ সুইট হোসেন নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি


নওগাঁয় ৩ বছরের ব্যবধানে ধানের দাম বেড়েছে মন প্রতি ৪’শ থেকে ৫শ’ টাকা। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে হাইব্রিট অর্থাৎ মোট জাতের প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সরকার পরিকল্পনামাফিক এলসি (বিদেশ থেকে চাল) চাল আমদানি না করা ও জেলার মিলারদের সিন্ডিকেটের কারণে দফায় দফায় ধান ও চালের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

চলতি বছরে হাওড়ে বন্যা ও নওগাঁয় ঝড় বৃষ্টিতে ধানের ফলন কম এবং মে মাসের পূর্বেই সরকারীভাবে ২৪ টাকা কেজি মূল্যে ধান কেনার ঘোষণা দেয়ায় গত বছরের তুলনায় মণে প্রায় তিনশ’ টাকা বেশি দরে প্রতি মণ ধান কেনা বেচা শুরু হয়েছে।

 

 

এ দিকে দেশে ধান উৎপাদন তুলনামূলক কম হওয়া অন্যদিকে এলসি’র চালের উপর ২৫ ভাগ কর আরোপকে ধান-চালের দাম বৃদ্ধিকে দায়ী করছেন মিলাররা।

 

জানা গেছে, প্রতি বছর মে মাসের শুরু থেকে জেলায় ধান-কাটা মাড়াই শুরু হয়। হাইব্রিট অর্থাৎ মোট জাতের ধান কাটা মাড়াইয়ের শুরুতে গত ২০১৫ সালের এই সময় ৫৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা মণ এবং ২০১৬ সালে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা মণ দরে ধান কেনা বেচা হয়েছে।

 

সংশ্লিষ্টরা সূত্রে জানা গেছে, সে সময় সরকারী ভাবে ধান সংগ্রহ শুরু হতো মে মাসের মাঝামাঝি থেকে। এ সময় জেলার মিলাররা ধান কেনায় বাজারে ধানের দাম পেতেন না কৃষকরা। অল্প দামে ধান বিক্রি করে কৃষকদের লোকসান গুণতে হতে। এ জন্যে প্রতি বছর কৃষকরা ও সংশ্লিষ্টরা সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের কাছে দাবি জানিয়েছেন- ধান কাটা মাড়াইয়ের শুরুতেই সরকারি ভাবে ধান কেনা শুরু করার। আগের বছরগুলোতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রাণালয় কৃষকদের দাবি কর্ণপাত না করলেও চলতি বোরো মৌসুমের শুরুতে ধান কেনার ঘোষণা দেন। ধানের দাম নির্ধারণ করে দেন ২৪ টাকা প্রতি কেজি।

 

রাণীনগর উপজেলার বড়গাছা গ্রামের বিশ্বজিত কুমার জানান, কৃষকরা বেশি দাম পাওয়ার আশায় প্রয়োজন ছাড়া ধান বিক্রি করছেন না। এ কারণে বাজারে ধানের আমদানি কম থাকায় গত বছরের তুলনায় মোটা জাতের ধান তিনশ’ থেকে ৪শ’ টাকা দরে জেলার মিলাররা বেশি দামে ধান কিনছে। অন্যদিকে চিকন (জিরাশাইল) জাতের ধানেরও একই অবস্থা। এতে কৃষকরা ভালো দাম পাচ্ছেন।

 

সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ১২শ’ রাইচ মিল রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে ১১শ’ হাসকিন রাইচ মিল। বাঁকিগুলো অটোমেটিক রাইচ মিল। এসব মিল থেকে প্রতি বছর ১৬ লাখ মেট্রিকটন চাল উৎপাদন হয়ে থাকে। এর মধ্যে ১২ লাখ মেট্রিকটন চাল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার রপ্তানী হয়ে থাকে।

 

জেলার মিলারদের সূত্রে জানা গেছে, এ মৌসুমের শুরু থেকেই স্থানীয় ধানের হাটে ধানের আমদানী কম হচ্ছে। আধা ভেজা ধান ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা মন দামে কিনতে হচ্ছে। কারণ হিসেবে তারা বলেন, কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধান মাড়াই করার সাথে সাথে তাদের বাড়ীতে গিয়ে বিভিন্ন ফরিয়ারা ধান কিনে নিয়ে আসে। এতে ধান কিনে চালের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

মোকামে পাইকারী মূল্যে ধান কেনা মিল মালিক শেখ ফরিদ হোসেন বলেন, এ বছর বোরো মৌসুমে ধান বাজারে আসার আগেই সরকারি ভাবে ২৪ টাকা কেজি দরে মূল্য নির্ধারণ করায় বাজারে ধানের আমদানি কম। কিছু কিছু চালকল মালিকরা প্রতিযোগীতা করে প্রতিমণ খাটো-১০ ও পারিজা জাতের ধান ৮৫০-৯০০ টাকা দরে কিনছেন। ভরা মৌওসুমে ধানের যে বাজার আগামীতে এই বাজার আরও বৃদ্ধি পাবে বলে আশঙ্কা করছেন।

 

অপর মিল মালিক নকিমূদ্দিন জানান, ধানের দাম অত্যন্ত বেশি হওয়ার মূল বিষয় হচ্ছে প্রাকৃতিক দূর্যোগে দেশে ধানের উৎপাদন কম হয়েছে। এ ছাড়া বাজারে চালের মূল্যে বৃদ্ধি হলে ধানের মূল্যে বৃদ্ধি হবে এটাই স্বাভাবিক।
জেলা চাল কল মালিক গ্রƒপের সাবেক সাধারন সম্পাদক নুরুল ইসলাম জানান, মোকামে চালের ব্যাপক চাহিদা থাকায় বাজারে ধানের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২ বছরে দেশে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে এই কারণে ধানের দাম কম ছিল। এ ছাড়াও সরকারী গোডাউনে ব্যাপক পরিমাণে চাল মজুদ ছিল। এবার বৈরী আবহাওয়ার কারণে ধানের আবাদ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় বাজারে ধানের দাম অনেক বেশি।

 

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) নওগাঁর সমন্বয়ক জয়নাল আবেদিন মুকুল জানান, সারাদেশে ৪০ জনের মতো বড় চাল ব্যবসায়ী রয়েছেন। এর মধ্যে নওগাঁয় ১৬ জন চাল ব্যবসায়ী। যারা সারাদেশে ধান-চাল ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। এই মিলাররা তাদের মিলে হাজার হাজার মণ ধান কিনে এবং চাল গুদামজাত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট দাম বৃদ্ধি করে।

 

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নওগাঁর সভাপতি এ্যাডভোকেট মহসিন রেজা জানান, বাজারে ধানের সংকট অন্যদিকে হাওর অ লে ধানের ক্ষেত নষ্ট হয়ে যাওয়ার সুযোগে জেলার মিলারদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধানের সংকট দেখিয়ে দিন দিন ধান ও চালের দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে ধান উৎপাদন করে কৃষকদের লোকসান গুণতে হলেও এ বছর কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধানের নায্য পাচ্ছেন।
তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি হাওর অ লে ধানের ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেলে তিন-চার মাস আগে থেকে নওগাঁয় দফায় দফায় চালের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। ধানের বাজারের সাথে চালের উৎপাদন খরচ কোন সামঞ্জস্য নেই। এতে দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষদের চাল কিনতে দিনের আয় শেষ হয়ে যাচ্ছে। সরকারি নজরদারির অভাবকেই দায়ি করছেন তিনি।

 

 

জেলা চাউল কল মালিক গ্রুপের সভাপতি আলহ¦াজ রফিকুল ইসলাম জানান, মিলারদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান ও চালের দাম বৃদ্ধি করা হয় এই অভিযোগ সঠিক নয়। একটি অটোমেটিক রাইচ মিল একবার চালু করলে একবারে তিন হাজার থেকে চার হাজার মণ ধান লাগে। সেখান ধানের পরিমাণ কম হলে হলে চালের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ মিলারদের লোকসান গুণতে হবে। এ জন্যেই মিলাররা তাদের মিল সচল রাখতে ধান কিনে রাখেন।

বার্তা কক্ষ মেইল:

news.crimewatchbd24@gmail.com

বার্তা কক্ষ মুঠোফোন:

+৮৮ ০১৯ ২০০ ৯৯২৮৮

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত "ক্রাইম ওয়াচ"

Design & Devaloped BY Popular-IT.Com