সোমবার, ১০ই বৈশাখ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ : ২৩শে এপ্রিল, ২০১৮ ইং

মৃত্যুর আগে নিজের বীর প্রতীক উপাধী গেজেটে প্রকাশ দেখে যেতে পারলেন না কাঁকন বিবি!

হাবিব সরোয়ার আজাদ

খাসিয়া সম্প্রদায়ের নারী কাঁকন বিবি। নিজের এলাকায় মুক্তি বেটি নামে পরিচিত এই বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিয়সী নারীর। বুধবার রাতে ৮৮ বছর বয়সে সিলেট এমএজি ওসমানী কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চলে গেলেন না ফেরার দেশে।’মৃত্যুর দ্বারপান্তে দাড়িয়েও কাঁকক বিবির প্রত্যাশা ছিল সরকার প্রধাদের দেয়া বীর প্রতীক উপাধীটি যেন গেজেটে প্রকাশিক হয়। কিন্তু গেজেটে বীর প্রতীক উপাধী প্রকাশ হয়েছে এমনটি জেনে বা দেখে যেতে পারেননি কাঁকন বিবি।

 

মুক্তিযুদ্ধে চলাকালে পাক বাহিনী আর রাজাকারদের হাতে বারবার নির্যাতিত হয়েছেন। তবু দমে যাননি এই নারী। পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েছেন সম্মুখ সমরে। অনেকেই জানেন, মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছিলেন কাঁকন বিবি।
১৯৯৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু তা আর গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়নি। গেজেটে খেতাব না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়েই চলে গেলেন কাঁকন বিবির।

 

দেশ স্বাধীন করার নিমিত্তে জীবনের শেষ আশা ত্যাগ করে কাঁকন বিবি বেছে নিয়েছিলেন গুপ্তচরবৃত্তি, পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েছেন কয়েকবার। তবে যুদ্ধ শেষে কোন এক অভিমানে দীর্ঘদিন লোকচক্ষুর আড়ালে ছিলেন। স্বাধীনতার ২৫ বছর পর ১৯৯৬ সালে জেলায় তৎকালীন সময়ে কর্মরত এক সংবাকর্মী ভিক্ষারত অবস্থায় খুঁজে পান।’ তখন কাঁকন বিবির দুর্বি:সহ জীবন চিত্র উঠে আসে গণমাধ্যমে। তৎকালীন সময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কাঁকন বিবিকে এক একর খাস জমি ও বীর প্রতীক উপাধি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত ওই জমিতেই ছোট্ট কুড়ের ঘরে বসবাস করতেন তিনি। একমাত্র মেয়ে সখিনা বিবি ও মেয়ের জামাই রফিক মিয়াকে নিয়েই ছিলো তাঁর ছোট্র সংসার।

 

বেসরকারীভাবে কাঁকন বিবি প্রথম স্বীকৃতি পান ১৯৯৮-তে দেশের জাতীয় একটি দৈনিক প্রত্রিকার দেয়া সংবর্ধনায়। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য এককালীন অর্থসহ প্রতি মাসে সম্মানী দেয়া হত ওই পত্রিকা থেকে।

 

কাঁকন বিবি মহান মুক্তিযুদ্ধে এক সাহসী নারীর নাম। নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে বেছে নেন গুপ্তচরবৃত্তির পথ। জীবনবাজি রেখে পাকিস্তানী মিলিটারির তথ্য সংগ্রহ করে আনতেন, সরবরাহ করতেন মুক্তিবাহিনীর মধ্যে। তাঁর দেয়া তথ্যানুযায়ী একাধিক মিশনে জয়ী হয় মুক্তিবাহিনী। সাহসী এই নারী সরাসরি অংশ নিয়েছেন আমবাড়ি, বাংলাবাজার, টেবলাই, বলিউরা, মহব্বতপুর, বেতুরা, দূরিনটিলা, আধারটিলাসহ প্রায় ৯টি সম্মুখযুদ্ধে।

 

জানা যায়, ১৯৭১ সালে জুন মাসে দোয়ারাবাজার সীমান্তে পাকবহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনী হেরে গেলে অনেকের সঙ্গে আটক হন পাক সেনাদের হাতে কাঁকন বিবিও। দিনের পর দিন তার ওপর চলতে থাকে পাক সেনাদের পাশবিক নির্যাতন। থেমে যাওয়ার নারী ছিলেন না তিনি। প্রতিশোধের আগুনে ফুঁসতে থাকেন। ক্যাম্প থেকে মুক্তি পাওয়ার পর পরিচয় হয় মুক্তিযোদ্ধা রহমতের সঙ্গে।

 

কাঁকন বিবিকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় সেক্টর কমান্ডার মীর শওকত আলীর সঙ্গে। মূলত তাঁর নির্দেশেই বেছে নেন গুপ্তচর বৃত্তির পথ। কাঁকন বিবির সরবরাহকৃত তথ্য মোতাবেক অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং কয়েকটি অপারেশন সফল হয়। তবে আবারও ধরা পড়েন তিনি, এবার বাংলাবাজারে। শুরু হয় তাঁর ওপর নির্যাতনের স্ট্রিমরোলার। দীর্ঘ এক সপ্তাহ চলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যা কলমের ভাষায় প্রকাশ অসম্ভব!

 

স্পর্শকাতর স্থান ছাড়াও শরীরের কোমল স্থানে চলে পাশবিক নির্যাতন! অজ্ঞান অবস্থায় মৃত ভেবে নরপিশাচরা তাঁকে ফেলে রেখে যায় সড়কের পাশে। সহ যোদ্ধাদের সেবায় ৭ দিন পর জ্ঞান ফিরে এলে ভারতের মেঘালয়ের বলাট সাব সেক্টরে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করানো হয়। সুস্থ হয়ে দেশে ফিরে এসে আবারও দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় প্রশিক্ষণ নেন অস্ত্র চালানোর। শুরু করেন পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম। বিজয় আসে আসে স্বাধীন বাংলার লাল সবুজের পতাকা।

 

সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা ও গবেষক, লেখক অ্যাডডভোকেট বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ৯৬ সালে কাঁকন বিবিকে বীর প্রতীক উপাধি দেয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। পত্র-পত্রিকায় তাকে বীর প্রতীক হিসেবে বলা হলেও গেজেট এখনও তা প্রকাশিত হয়নি।

 

১৯৭১ সালে তিন মাস বয়সী মেয়ে সখিনাকে রেখে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন কাঁকন বিবি। প্রথমে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে গুপ্তচরের কাজ করলেও পরবর্তী সময়ে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। পাক বাহিনীর হাতে আটক হয়ে নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন এ বীর নারী যোদ্ধা।

 

কাঁকন বিবির মেয়ে সখিনা বিবি বৃহস্পতিবার দুপুরে বললেন, ‘সরকার বীর প্রতীক খেতাব দিলেও তা গেজেটভুক্ত না হওয়ায় আমার মায়ের মনে কষ্ট ছিল।’ মায়ের বীর প্রতীক উপাধী দ্রত গেজেটভুক্তির দাবি জানাচ্ছি।’

৭১’র কাঁক বিবি
গুপ্তচর হয়ে পাক সেনাদের তথ্য সংগ্রহ করে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে খবর পৌছাতেন মিজোরামের খাঁসিয়া পরিবারের জন্ম নেয়া কাঁকন বিবি
৭১’র কোনো একদিনের কথা। তিনি ভিক্ষে করতে করতে চতুর্থবারের মতো পাকিস্তানীদের টেংরা ক্যাম্পের দিকে যাচ্ছিলেন। ঠিক জুম্মার আজানের সময়, সড়কে তাকে আটকে ফেলল কয়েকজন পাক সৈন্য।

 

মুক্তিযুদ্ধের লেখক ও সহযোদ্ধাদের সাথে কাঁকন বিবির বীরত্বগাথা ও ত্যাগের জীবন যাপন নিয়ে আলাপকালে জানা যায়, একাধিকবার ক্যাম্পে আসায় সৈন্যরা তার সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর যে যোগাযোগ আছে সেটা স্বীকার করানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তার এক কথা, ‘আমি আমার স্বামী আবদুল মজিদ খানের খোঁজে ক্যাম্পে যাই’।

 

এর পরই শুরু হয় তার ওপর প্রচন্ড শারীরিক নির্যাতন। গাছের সঙ্গে বেঁধে ফেলে নিষ্ঠুরভাবে পিটাতে শুরু করল তাকে। শরীর দিয়ে দরদর করে রক্ত পড়ছে। এভাবে দীর্ঘক্ষণ প্রচন্ড অত্যাচারের মুখে তার শরীর একেবারে ভেঙে পড়ে। জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তিনি। একপর্যায়ে পাকহানাদাররা মোটা লোহার শিক গরম করে তার উরু দিয়ে ঢুকিয়ে দেয়।

 

এ হেন নির্যাতনের পরও তার মুখ থেকে কোনো কথা বের করতে পারেনি পাকিস্তানী সৈন্যরা। পাকিস্তানীদের নিষ্ঠুর অত্যাচার সহ্য করা এই নারীটি হচ্ছেন কাঁকন বিবি। ইতিহাস যাকে চেনে বীরাঙ্গনা কাঁকন বিবি নামে। তিনি ছিলেন, মুক্তিবাহিনীর ‘ইনফরমার’ গুপ্তচর।’ তিনি কখনোই স্বীকার করেননি ভিক্ষুকের বেশে পাকিস্তানীদের ক্যাম্পে গিয়ে মুক্তিবাহিনীর জন্য খবর বয়ে আনেন।

 

তিনি জানেন এই সত্য কথাটি হায়েনার দল জেনে গেলে তা দেশের জন্য, দেশের মুক্তিবাহিনীর জন্য চরম অমঙ্গল হবে। তাই তো পাকবাহিনীর নির্মম অত্যাচারের মুখেও তিনি চুপ করে ছিলেন। তার বয়স এখন আশি বছরের ওপরে। জন্মেছিলেন ব্রিটিশ ভারতের মিজোরাম প্রদেশে।

 

সুনামগঞ্জের দোয়রাবাজারের কাঁঠালবাগান গ্রামটি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের খুব কাছে। গ্রাম থেকে একটু দূরেই ছিল পাকিস্তানী সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর ক্যাম্প। সেই ক্যাম্পে সৈনিক হিসেবে কাজ করত পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের আবদুল মজিদ খান। আবদুল মজিদ খানের সঙ্গে কাঁকন বিবির বিয়ে হয় ১৯৫৮ অথবা ৫৯ সালে।

 

বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে কর্মস্থল বোগলা ক্যাম্পে ওঠেন তিনি। আবদুল মজিদ খান বিভিন্ন সময় বিভিন্ন স্থানে বদলি হতেন। কাঁকন বিবিকেও তিনি সঙ্গে নিয়ে যেতেন। আবদুল মজিদ খান সিলেট আখাালিয়া ক্যাম্পে থাকা অবস্থায় কাঁকন বিবিকে পরিত্যাগ করেন। তারপর হঠাৎ করেই আবদুল মজিদ খান উধাও হয়ে যান।

 

কাঁকন বিবি একা হয়ে পড়েন। স্বামীর খোঁজে তিনি ক্যাম্পের অন্যান্য সৈনিকদের কাছে অভিযোগ করেন, অফিসে গিয়েও নালিশ করেন। কিন্তু সবাই তাকে অসহযোগিতা করে। শেষ পর্যন্ত স্বামীর কোনো খোঁজখবর করতে না পেরে কাঁকন বিবি তার ভগ্নিপতি ও বোনের সংসারে চলে আসেন। পরবর্তীতে প্রতিবেশী শাহেদ আলীর সঙ্গে কাঁকন বিবির পুনরায় বিয়ে হয়। কাঁকন বিবির গর্ভে জন্ম নেয় এক কন্যা সন্তান। নাম সখিনা বিবি। সখিনা যখন তিন মাসের শিশু তখনই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।

 

সুনামগঞ্জ-সিলেট অ লটি ছিল পাঁচ নম্বর সেক্টরের অধীনে। এই সেক্টরের কমান্ডার ছিলেন লে. কর্নেল মীর শওকত আলী। কাঁকন বিবি যে গ্রামে থাকতেন তার পাশেই মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।

 

আবার এই ক্যাম্প থেকে খানিকটা দূরেই ছিল পাকিস্তানীদের ক্যাম্প। যা স্থানীয়ভাবে টেংরা ক্যাম্প নামে পরিচিত। মুক্তিবাহিনীর যে ক্যাম্প ছিল তার কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন শহিদ মিয়া। মীর শওকত আলী একদিন এই ক্যাম্প পরিদর্শনে আসেন। তিনিই মূলত কাঁকন বিবিকে পাকিস্তাানীদের ক্যাম্প থেকে খবর সংগ্রহের কাজে উৎসাহিত করেন। কাঁকন বিবির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি তাকে কাজের গুরুত্বও বুঝিয়ে দেন।

 

কাঁকন বিবি মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত হন একজন ‘ইনফরমার’ হিসেবে। যার কাজ ছিল পাকিস্তানী ক্যাম্পে ঢুকে তাদের হাতিয়ারের ধরন, সংখ্যা ও সৈনিকদের অবস্থান সম্পর্কে খবর সংগ্রহ করা। স্বামী শাহেদ আলী তার এই কাজে বাধা দিলেও তিনি তা উপেক্ষা করেন। সেই কঠিন দায়িত্ব পালন করার জন্য তিনি কয়েকদিন সময় নেন। চিন্তা করেন।

 

পরে নিজেই বুদ্ধি খাটিয়ে একটি ময়লা ও ছেঁড়া কাপড় পরে একদিন ভিক্ষা করতে করতে রওনা দেন টেংরা ক্যাম্পের দিকে। কৌশলে ঢুকে পড়েন টেংরা ক্যাম্পের ভেতর। পাক সেনারা তাকে কিছু ময়দা ও আটা ভিক্ষা দেয়। ভিক্ষা করার পাশাপাশি মিলিটারিদের কাছে তার প্রথম স্বামী আবদুল মজিদ খানের খোঁজও করেন।

 

নানা কায়দায় কিছুক্ষণ ক্যাম্পের ভেতর অবস্থান করে সবকিছু দেখার চেষ্টা করেন এবং প্রথম দিন তিনি খুব ভালোভাবেই তার দায়িত্ব পালন করেন। টেংরা ক্যাম্পে তিনি যা দেখেছেন তা সবই এসে জানান কোম্পানি কমান্ডার শহিদ মিয়াকে। মুক্তিবাহিনী তখন সেই মোতাবেক তাদের অপারেশন চালায় এবং এতে তারা সফলও হয়।

 

দ্বিতীয় দিনও কাঁকন বিবি একই কায়দায় টেংরা ক্যাম্পে প্রবেশ করেন। মিলিটারির কাছে তার স্বামীর খবর জানতে চাইলে তাকে আটক করা হয়। কয়েকজন পাক হানাদার বাহিনীর সদস্য মিলে চালায় শারীরিক নির্যাতন। কিন্তু তখনো পর্যন্ত কাঁকন বিবি একজন ‘ইনফরমার’ এটা তারা ভাবতে পারেনি। নির্যাতন শেষে তারা কাঁকন বিবিকে ছেড়ে দেয়।’

 

ওই ঘটনার পর কাঁকন বিবি বেশ কিছুদিন আর টেংরা ক্যাম্পে যাননি। টেংরা ক্যাম্পে ‘ইনফরমার’ হিসেবে কাজ করেছেন কাঁকন বিবি, এই খবর জানামাত্রই দ্বিতীয় স্বামী শাহেদ আলী রেগে আগুন হয়ে যান। তিনি কাঁকনকে প্রচন্ড মারধর করেন। একপর্যায়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন ‘নষ্টা মেয়ে’ বলে। একমাত্র মেয়ে সখিনা বিবিকে শাহেদ আলী নিজের কাছেই রেখে দিলেন। শাহেদ আলী আবার বিয়ে করলেন।’

 

এই দুঃসময়েও কাঁকন বিবি ‘ইনফরমার’ হিসেবে কাজ করার জন্য যান সুনামগঞ্জে অবস্থিত পাকহানাদার বাহিনীর ক্যাম্পে। সেখান থেকে যান সিলেট ক্যাম্পে। পরে যান গোবিন্দগঞ্জ, জাউয়া বাজার ক্যাম্পে। সব জায়গাতেই তার একই কাজ। ক্যাম্পের অবস্থান, সৈন্য সংখ্যা, হাতিয়ার ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণা নিয়ে আসা। যেতেন সেই ভিক্ষুকের বেশেই। পাকিস্তানী সৈন্যদের কাছে খোঁজ করতেন নিজের প্রথম স্বামীর।

 

বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে কাজ শেষ করে কাঁকন বিবি আবার নিজের গ্রাম কাঁঠালবাড়িতেই ফিরে আসেন। দীর্ঘদিন পর কোম্পানি কমান্ডার শহিদ মিয়ার নির্দেশে তৃতীয় বারের মতো তিনি আবার যান টেংরা ক্যাম্পে। তৃতীয়বারও নানা নির্যাতনের মুখে পড়েন তিনি।

 

কাঁকন বিবি ক্যাম্প থেকে খবর সংগ্রহ করে মুক্তিবাহিনীর কাছে প্রেরণ করছেন তা স্থানীয় কয়েকজন রাজাকার সন্দেহ করে। ওইসব রাজাকাররা পাকিস্তানী ক্যাম্পে গিয়ে অফিসারদের কাছে তাদের সেই সন্দেহের কথা জানায়। পাকিস্তানী সৈন্যরা তাকে ধরে নিয়ে অকথ্য নির্যাতন চালায়। যে নির্যাতনের বর্ণনা শুরুতেই বলা হয়েছে।

 

কাঁকন বিবিকে নির্যাতনের একপর্যায়ে পাকবাহিনীর বড় অফিসার এসে দেখেন কাঁকন বিবি অজ্ঞান। অফিসার ডাক্তার ডাকালেন। ডাক্তার এসে ইনজেকশন দিয়ে কাঁকন বিবির জ্ঞান ফেরাল। তারপর তাকে কিছু খাবারও দেয়া হলো। কিন্তু কাঁকন বিবির খাওয়ার মতো শারিরীক সামর্থ্যও ছিল না। উরুতে যে গরম লোহার শিক ঢোকানো হয়েছে তার যন্ত্রণায় তিনি সবকিছু অন্ধকার দেখতে থাকেন। এর মধ্যেই অফিসার তাকে জিজ্ঞেস করে, তুমি কেন ক্যাম্পে যাও? কাঁকন বিবি অস্ফুট স্বরে উত্তর দিলেন, স্বামীর খোঁজে।

 

অফিসার আবার জিজ্ঞেস করল, কে তোমার স্বামী? কাঁকন বিবি বললেন, আবদুল মজিদ খান। অফিসার তখন ক্যাম্পে ফিরে গিয়ে সিলেটে ওয়্যারলেস করেন। সেখানে সত্যিকার অর্থেই আবদুল মজিদ খান নামে কোনো সৈনিক আছে কি না তা জানার জন্য। আবদুল মজিদ খান তখন সিলেটেই ছিলেন। কিন্তু তিনি ক্যাম্পের বাইরে ছিলেন।

 

মজিদ খান ক্যাম্পে ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই অফিসার তার সঙ্গে কথা বলে। অফিসার মজিদ খানের কাছে জানতে চায়, কাঁঠালবাড়িতে তার কোনো স্ত্রী আছে কি না? মজিদ খান স্বীকার করে, কাঁকন বিবি নামে তার স্ত্রী কাঁঠালবাড়িতে থাকেন। অফিসার মজিদ খানের কাছ থেকে এই তথ্য পাওয়ার পর কাঁকন বিবিকে পাকহানাদাররা ছেড়ে দেয়।’

 

কাঁকন বিবি মহান মুক্তিযুদ্ধে এক সাহসী নারীর নাম। নানা নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে বেছে নেন গুপ্তচরবৃত্তির পথ। জীবনবাজি রেখে পাকিস্তানী মিলিটারির তথ্য সংগ্রহ করে আনতেন, সরবরাহ করতেন মুক্তিবাহিনীর মধ্যে। তাঁর দেয়া তথ্যানুযায়ী একাধিক মিশনে জয়ী হয় মুক্তিবাহিনী। সাহসী এই নারী সরাসরি অংশ নিয়েছেন আমবাড়ি, বাংলাবাজার, টেবলাই, বলিউরা, মহব্বতপুর, বেতুরা, দূরিনটিলা, আধারটিলাসহ প্রায় ৯টি সম্মুখযুদ্ধে।
১৯৯৬ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে বীর প্রতীক উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু তা আর গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়নি। গেজেটে খেতাব না পাওয়ার আক্ষেপ নিয়েই চলে গেলেন কাঁকন বিবির।

 

কাঁকন বিবির মেয়ে সখিনা বিবি বৃহস্পতিবার দুপুরে বললেন, ‘সরকার বীর প্রতীক খেতাব দিলেও তা গেজেটভুক্ত না হওয়ায় আমার মায়ের মনে কষ্ট ছিল।’ মায়ের বীর প্রতীক উপাধী দ্রত গেজেটভুক্তির দাবি জানাচ্ছি।

© ২০১৭ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত "ক্রাইম ওয়াচ"